ডিজিটাল আসক্তিতে ধ্বংসের মুখে শিক্ষার্থী
বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার কোমলমতি শিশুরা এখন বড় ধরনের ঝুঁকিতে। তাদের নিয়ে মা-বাবার চোখে-মুখে যে আশা-জাগানিয়া স্বপ্নের বসবাস, সেখানে এখন শঙ্কার কালো মেঘ।
রাত জেগে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করা এখন দেশের কিশোর-কিশোরীদের একটি অংশের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি তাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, পড়াশোনায় মনোযোগ কমাচ্ছে, আর বাড়িয়ে দিচ্ছে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, নরওয়ের মতো উন্নত দেশগুলো যখন ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে, বাংলাদেশে এখনো তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, এরপর ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম। এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি তরুণদের মধ্যে।
মনোযোগ ও পারিবারিক সম্পর্ক ধ্বংস করছে : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপপ্রয়োগ এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে লাগামহীন ‘স্ক্রিনটাইম’ বৃদ্ধি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক মানসিক ও শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব।
তিনি বলেন, “যেকোনো নেশার মতো ইন্টারনেট আসক্তিও মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে মানুষের মনোযোগ ও স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়। অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতার কারণে শিশুদের কল্পনাশক্তি লোপ পাচ্ছে। আসক্ত ছেলেমেয়েরা বাস্তব জগৎ ছেড়ে এক কাল্পনিক ‘ফ্যান্টাসি’র মধ্যে বাস করছে।”
তিনি জানান, এই ব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অন্ধকার ঘরে একা থাকা, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া না করা, গোসল বা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় অনীহার পাশাপাশি চোখের ‘ড্রাই আই’ রোগ দেখা দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কে; সন্তানরা মা-বাবার কাছ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের মানুষকে অবিলম্বে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
‘ডিজিটাল আসক্তি’ ভবিষ্যতের জন্য হুমকি : মাদকাসক্তির মতোই এই ‘ডিজিটাল আসক্তি’ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে উদ্বেগ জানিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্মুক্ত এই প্ল্যাটফর্মের ইতিবাচক দিক থাকলেও বর্তমানে এর নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব তরুণ প্রজন্মের চিন্তা করার ক্ষমতা, মননশীলতা ও সৃজনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তথ্যবিনিময় বা মেধার স্বীকৃতির উদ্দেশ্যে এটি তৈরি হলেও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক বা নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে এটি এখন এমন এক খোলা ময়দানে পরিণত হয়েছে, যা পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, অনেক দেশ এরই মধ্যে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করছে এবং বাংলাদেশকেও এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এটি নিয়ে কঠোরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
গবেষণায় যা উঠে এসেছে : ‘নেচার অ্যান্ড সায়েন্স অব স্লিপ’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা এক হাজার ১৩৯ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির মাত্রা যত বাড়ে, ঘুমের মান ততই খারাপ হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, উল্লেখযোগ্য লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও নারী শিক্ষার্থীদের ঘুম আসক্তির প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে মোট আসক্তির হার তুলনামূলক বেশি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) জানিয়েছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে (মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটার) এবং গেমিং ডিভাইসে কাটায় সময় কাটাচ্ছে, যা তাদের ঘুম, শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, মাথা ব্যথা, চোখের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য জটিলতা বাড়ছে।
ঘুমের অবনতি ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি : সামাজিক মাধ্যমের আসক্তি তরুণদের ঘুম ধ্বংস করছে। ‘নেচার অ্যান্ড সায়েন্স অব স্লিপ’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা এক হাজার ১৩৯ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তির মাত্রা যত বাড়ে, ঘুমের মান ততই খারাপ হয়। আসক্তির দুটি উপসর্গ—বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং দিনের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া ঘুমের ব্যাঘাতের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের ঘুমের গুণমান অত্যন্ত খারাপ। তারা রাতে বারবার জেগে ওঠে, আবার অনেকেই মোবাইল হাতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। এর প্রতিফলন ঘটে দিনের কর্মক্ষমতায়—শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, পড়া মনে রাখতে সমস্যা হয়, বিরক্তি ও হতাশার মাত্রা বাড়ে। আর এই অস্থির মানসিকতা থেকেই অনেক কিশোর সহিংস গ্যাং কালচারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব যখন কঠোর হচ্ছে : গত সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ‘হাইলি ইফেকটিভ এজ অ্যাশিওর্যান্স’ বা কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে, যেখানে মুখমণ্ডল স্ক্যান বা পরিচয়পত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে বয়স নিশ্চিত করা হবে।
এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক, এক্স ও ইউটিউবের মতো ১০টি প্ল্যাটফর্ম পড়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৪৯.৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।
ফ্রান্স আগামী জানুয়ারি থেকে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার এবং হাই স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের প্রস্তাব বিবেচনা করছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অস্ট্রিয়া, স্পেন, গ্রিস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, পোল্যান্ড ও স্লোভেনিয়াও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ব্রাজিল নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে অ্যাকাউন্ট খোলার বাধ্যবাধকতা চালু করেছে। আর চীন ‘মাইনর মোড’ চালু করে বয়সভেদে স্ক্রিন টাইম সীমিত করেছে—১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য দৈনিক ৪০ মিনিট এবং ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য দুই ঘণ্টা। পাশাপাশি রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নাবালকদের অনলাইন গেমিং ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে চীন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’-এর আওতায় শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন শিশু-কিশোর-তরুণদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়নে ব্যস্ত, বাংলাদেশের শিশু-তরুণরা কি সেই সুরক্ষা থেকে কেন বঞ্চিত—সে বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারছেন না নীতিনির্ধারকরা।
আইনি নোটিশ ও সরকারি অবস্থান : গত মাসে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী ১৬ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। নোটিশে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও অপব্যবহার রোধে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
নেই আইন, নেই কার্যকর নজরদারি : দেশে শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কোনো বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা নেই। ‘শিশু আইন ২০১৩’-এ অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই। ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ প্রাথমিকভাবে সাইবার অপরাধ দমনে তৈরি, শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষায় নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণীত হলেও এতে শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার কোনো বিধান নেই।
অথচ ইউনিসেফের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের দুই-তৃতীয়াংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষতিকর আচরণ বন্ধে কঠোর নীতির পক্ষে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ২৯ হাজার তরুণের মধ্যে ৪৫ শতাংশ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। কিন্তু সেই নীতি প্রণয়নে সরকারের তৎপরতা নেই বললেই চলে।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও সহজেই অ্যানড্রয়েড ফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। অভিভাবকরাও অনেকেই সন্তানদের স্ক্রিন টাইমের মারাত্মক প্রভাব সম্পর্কে অবগত নন। অনেকে শিশুকে ব্যস্ত রাখতে মোবাইল বা ট্যাব হাতে তুলে দেন, অথচ জানেন না তারা কী দেখছে।
পর্দায় গ্যাং কালচার ও আতঙ্কের পরিসংখ্যান : সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, অপরাধের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে কিশোরদের। র্যাবের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে মোট এক হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ ধরা পড়েছে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত অভিযানে। গ্রেপ্তার হওয়া এসব কিশোরের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ও বিভিন্ন অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ : তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নীতিগতভাবে ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিষিদ্ধ করাকে আমি সমর্থন করি। তবে আইনের চেয়ে প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শিশুদের এবং অভিবাবকদের সচেতনতা বাড়ানো। প্রয়োজন শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও সু্স্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞানী ড. মো. তৌহিদুল হক উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও সহজেই অ্যানড্রয়েড ফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট পাচ্ছে, যা কিশোরদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা স্বাভাবিক যোগাযোগের দক্ষতা হারাচ্ছে, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে এবং পারিবারিক-সামাজিক মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে। ভিনদেশি লাইফস্টাইলের প্রভাবে আইন না মানার প্রবণতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকলাঙ্গতার ঝুঁকি বাড়ছে।’
করণীয় : দেশের শিশু-তরুণদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সরকার, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্মগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিশু-তরুণদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রথমত, বাংলাদেশেও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক মাধ্যম কম্পানিগুলোর জন্য বয়স যাচাই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্কুল পর্যায় থেকেই পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার বুলিং মোকাবেলার বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রম চালু করা দরকার।
চতুর্থত, অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
পঞ্চমত, বিশেষ করে ‘সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংশোধন করে শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো সামাজিক মাধ্যম কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর জরিমানার বিধান রাখা দরকার।
এ ছাড়া ইউনিসেফের সুপারিশ অনুসারে অনলাইনে শিশুদের অধিকার রক্ষায় কঠোর নীতি প্রণয়ন, মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমের সমস্যা নিয়ে আলাদা কর্মসূচি, স্কুলভিত্তিক কাউন্সেলিং সেন্টার ও হেল্পলাইন চালুর এবং নিয়মিত সচেতনতা প্রচারণা জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর কালের কণ্ঠকে কলেন, ‘বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বিষয়টি নীতি পর্যায়ে গুরুত্ব পাওয়া জরুরি। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাড়লেও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়েনি; বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অভিভাবকরাই অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞ। সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু-কিশোর সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্ত এবং সাইবার বুলিং, ভুয়া তথ্য ও অনলাইন শোষণের শিকার হচ্ছে। তাই বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সুস্পষ্ট নীতিকাঠামো জরুরি।’
টিনএজারদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ির বিষয়ে চিন্তা : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, “বিদেশে ১৬ বছর বা তার কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে যে ধরনের আইনি কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে, তা আমাদের দেশেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার মধ্যে রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করছি। যেহেতু বিশ্বের অনেক দেশই এখন ‘টিনএজার’ বা কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় এটি নিয়ে আইনগত কাজ করছে, তাই সেই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও দ্রুতই এসংক্রান্ত কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।”
আইসিটি সচিব আরো বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দায়িত্বশীল ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আইসিটি বিভাগের অধীন জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (এনসিএসএ) এবং আইসিটি খাতের সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলো সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। তারা নিয়মিতভাবে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা’ বাস্তবায়ন ও এর যথাযথ তদারকি (মনিটরিং) নিশ্চিত করছে।”
No comments yet
Be the first to join the discussion.